আমি বাংলাদেশের এক কলেজে পড়ি। এবার এইচএসসি পরীক্ষা দেবো, কী করলে আমি অক্সফোর্ড, হার্ভার্ডের মতো বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়তে পারব?

যেহেতু আমি অক্সফোর্ড বা কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ে নেই তাই সরাসরি আপনাকে উপদেশ দেওয়া ঠিক নয়। কিন্তু যেহেতু আমি ইউরোপের একটি বিশ্ববিদ্যালয়ে (আয়ারল্যান্ডের “উনিভার্সিটি কলেজ কর্ক”(University College Cork) এর অন্তর্গত “টিনডাল ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট” (Tyndall National Institute)) উচ্চশিক্ষার জন্য সুযোগ পেয়েছি, তাই আপনার সঙ্গে আমি আমার ছোট্ট অভিজ্ঞতা ভাগ করে নিচ্ছি। জানি না কোনো উপকারে লাগবে কিনা, লাগলে খুবই খুশি হব।

আমরা যারা ভারত, বাংলাদেশ বা পাকিস্তানের বাসিন্দারা যাদের প্রথম ভাষা (First Language) ইংরেজি নয় কিন্তু বাইরে পড়তে যেতে ইচ্ছুক, তাদের বাইরে সুযোগ পাওয়ার ক্ষেত্রে প্রথম এবং প্রধান বাধা বা সমস্যা হলো যে, ওই সমস্ত বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে আপনাকে প্রমান করতে হবে আমি বা আপনি ইংরেজিতে দক্ষ। এখন প্রশ্ন হচ্ছে, আপনি নিজে জানেন যে, আপনি ইংরেজি খুবই ভালো না জানলেও এটা নিশ্চিত আপনি বুঝিয়ে দিতে পারবেন আপনার ইংরেজি দিয়ে। হয়ত এমনও হতে পারে যে, আপনি ইংরেজি মাধ্যমে পড়াশুনাও করেছেন। কিন্তু ওরা তা মানতে রাজি না। কেন না ওরা ওদের ইংরেজির মানের সাথে তুলনা করার জন্যে এবং আপনি কেমন ইংরেজি জানেন তা যাচাই করার জন্যে কিছু “ইংরেজি”-এর পরীক্ষা নেওয়ার ব্যবস্থা রেখেছে। ওই পরীক্ষা দিয়ে আপনাকে আপনার ইংরেজির গুণগত মানের প্রমাণ দিতে হয়। আমার জানা তিনটে ইংরেজি পরীক্ষার নাম হলো: আইইএলটিএস(IELTS), টিওএফএল(TOEFL) এবং জিআরই (GRE)। এই তিনটে পরীক্ষার মধ্যে GRE কেবলমাত্র আমেরিকার জন্যেই দিতে হয় এবং এটা বাধ্যতামূলক। TOEFL দিয়ে ইউরোপের দেশগুলোতে পাওয়া যায়। কিন্তু IELTS (আমি এটা দিয়েই এসেছি) ইউরোপ এবং আমেরিকা দুই জায়গাতেই নেওয়া হয়। সুতরাং, মোট কথা হলো যে, আপনাকে এই ইংরেজি পরীক্ষা গুলো দিতেই হবে। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে, এই যে এরা ঘটা করে ইংরেজির পরীক্ষা নেবে এতে থাকেটা কি!? ভয় পাওয়ার কোনো প্রয়োজন নেই (বলছি বটে, আমিও কিন্তু খুবই ভয় পেয়েছিলাম এবং খুব চাপেই ছিলাম )। সমস্ত পরীক্ষার ক্ষেত্রেই মোট চারটে পার্ট রয়েছে যথাক্রমে: পাঠ্য অংশ (Reading Section), শ্রুতি অংশ (Listening Section), লেখনী ( Writing Section), কথোপকথন (Speaking Section) এবং সময় 2 ঘন্টা প্রথম তিনটে অংশের (Reading, Listening, Writing) জন্য একই দিনে এবং পরে অন্য আর একদিন 15 মিনিটের Speaking Section। পরীক্ষার ধরণটা কি চেনা লাগছে! লাগা উচিৎ। না লাগলেও চাপ নেই। বুঝিয়ে বলার চেষ্টা করছি। ছোটবেলায় আমরা সবাই ইংরেজি পরীক্ষা দিয়েছি এবং জানি কেমন হত; প্রথমে Seen, Unseen, Grammar, Writing এবং শেষে মৌখিক(Oral test বা Viva-Voce)। এখানেও একদমই একই জিনিস! শুধুমাত্র একটাই ফারাক- Seen এর জায়গায় পুরোটাই Unseen কোনো সাজেশন কাজে লাগবে না, Listening এ শুনে 30 মিনিটের মধ্যে উত্তর দিতে হবে আর Writing এ একটা মাত্র লাইনকে 250 শব্দে লিখতে হবে এবং একটা ছবির থেকে 150 শব্দের অনুচ্ছেদ লেখা। আরও একটা ব্যাপার হলো যে, সঙ্গে 12650/- টাকা ( ভারতীয় মুদ্রায়) [খুব সম্ভবত 195€] পরীক্ষার ফী!

এবারের প্রশ্ন হচ্ছে যে, শুধু কি দিলেই হয়ে যাবে! উত্তর হচ্ছে, না। সাধারণত সমস্ত পরীক্ষার ক্ষেত্রেই যেমন নূন্যতম পাশ নম্বর থেকে থাকে, তেমনই এই সমস্ত বিশ্ববিদ্যালয়গুলো একটা নূন্যতম পাশ মার্ক্স রেখেছে। সাধারণত IELTS এর ক্ষেত্রে BAND 6.5 ( মোট BAND 9) , TOEFL এর ক্ষেত্রে 88 বা 92 (মোট 120) এবং GRE এর ক্ষেত্রে 310–320 (মোট 340) পেতে হবে। নাহলে আপনার চেষ্টাই শুধু মাঠে মারা যাবে না সাথে অতগুলো টাকাও যাবে। আর এরা এই নূন্যতম মার্কসের ব্যাপারে খুবই স্ট্রিক্ট। তাই আমার ব্যক্তিগত মতামত, পরীক্ষা দেওয়ার আগে খুব খুব…খুব ভালো করে প্রস্তুতি নিয়ে দেওয়া উচিৎ।

এখন মনে হচ্ছে যে, আমি এই পরীক্ষায় পাশ করে গেলেই চান্স পেয়ে গেলাম! আবারও উত্তর হচ্ছে যে, না। এর সঙ্গে লাগবে আপনার একাডেমিক রেজাল্ট, পূর্ববর্তী কাজের অভিজ্ঞতা, আপনার স্যারের সুপারিশ পত্র (Recommendation Letter)। তার আগে অবশ্য থাকে যে, যেখানে আপনি apply করতে যাচ্ছেন, সেই স্যারের কাছে ব্যক্তিগত সাক্ষাৎকার (Personal Interview) (আমার ক্ষেত্রে 5 বার)। সেটা ফোনেও হতে পারে বা স্কাইপে। আপনাকে হয়ত রিসার্চ প্রপোজালও লিখতে হতে পারে (যেমন আমাকে লিখতে হয়েছিল)। আর একটা ব্যাপার হচ্ছে যে, আমি এটা ধরেই নিয়ে লিখেছি যে, আপনি আপনার নিজের ফিল্ডেই apply করছেন। মানে, আপনি condensed matter physics পড়ে quantum mechanics এ apply করছেন! এইরকম যে হতে পারে না তা নয়, কিন্তু চান্স অনেক কম।

বিদেশে পিএইচডি কিন্তু দেশের (উল্লেখ্য আমি ভারতের কথা বলতে চেয়েছি, বাংলাদেশের পিএইচডি সম্পর্কে আমার সত্যি কোনো ধারণা নেই) মত করে হয় না- প্রোজেক্ট এর ভিত্তিতে হয় (ভারতে UGC বা CSIR মাসিক বৃত্তি দেয়, নেট পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হতে পারলে! বা আইআইটি(IIT)তে অনেক সময়ই আইআইটি নিজেরাই ছাত্রদের মাসিক বৃত্তি দিয়ে থাকে।)। অর্থাৎ, এখানে যখন আপনি পিএইচডি এর জন্যে কোনো বিজ্ঞাপন দেখে আবেদন করেছেন, তখন এটা মাথায় রাখতে হবে যে, ওই প্রফেসর এর কাছে কোনো নির্দিষ্ট প্রজেক্ট রয়েছে। ঐখান থেকেই আপনিও আপনার মাসিক বৃত্তি (Monthly Fellowship) পাবেন। আর এই পিএইচডি এর সময়ে, কোর্স ফী বাবদ ব্যায়ের সম্ভাব্য পরিমান সম্পর্কে বলতে গেলে বলতে হয় যে, যেই পরিমান ইউরো কোর্স ফী, তা দেওয়া (আমার মত) সাধারণ বাড়ীর ছেলেপুলেদের পক্ষে এককথায় অসম্ভব! কারণ কিছুই না…ফী এর পরিমাণ- বছর প্রতি পনের হাজার ইউরো ( 15000€/বছর ) অর্থাৎ বছর প্রতি বার লক্ষ ( 12,00,000 টাকা /বছর), যা হয়ত অনেক বাড়িরই সারা বছরের মোট আয়ের থেকে অনেকটাই বেশি। সুতরাং এই ক্ষেত্রে কি হয়, আপনি যখন ওই পরীক্ষা গুলো দেবেন তখন এখানে আপনার সুপারভাইজার তাঁর নিজের প্রোজেক্ট ফান্ড থেকে আপনার হয়ে ফী জমা দেন। অর্থাৎ অন্য ভাবে দেখতে গেলে বলতে হয় যে, প্রতি বছরই পিএইচডি ছাত্রটি কিন্তু ওই টাকাটাও পাচ্ছে।

আর একটা ব্যাপার হচ্ছে যে, আপনি যদি জার্মানি বা ফ্রান্সে apply করেন সেই ক্ষেত্রে আপনার কোনো পরীক্ষা দিতে হয় না। কিন্তু আপনাকে ওখানে গিয়ে প্রাথমিকভাবে জার্মান বা ফরাসি ভাষায় নূন্যতম দক্ষতা অর্জন করতে হবে।

ধৈর্য্য ধরে পড়ার জন্য আন্তরিক ধন্যবাদ।

আশা করি, বাইরে উচ্চশিক্ষার জন্য পড়তে যাওয়া বা সুযোগ পাওয়া এই বিষয়ে ধারণাগুলো পরিষ্কার হয়েছে। কিছু জিজ্ঞাস্য থাকলে দয়া করে জানাবেন। আমি আমার সাধ্যমত চেষ্টা

Leave a Reply